সেই ডাক্তার সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের আজ হেরে গেলেন সময়ের কাছে, বয়সের কাছে, স্বাস্থ্যের কাছে!
স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের তুখোড় মেধাবী ছাত্র হিসেবে ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস সম্পন্ন করার পাশাপাশি ঢামেক ছাত্র সংসদের জিএস নির্বাচিত হোন!
বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি থাকাকালে ১৯৮৫-৮৭ তে শিবিরকে ব্যাপক পরিচিতি পাইয়ে দেন দেশ পেরিয়ে বৈশ্বিক পরিসরে!
কথায় আছে, ডা. তাহেরের সময়ে শিবিরকে চিনেছিলো বাংলাদেশ! খাতা-পত্র, ক্র্যাস্ট কিংবা লকেট, গ্লাস-প্লেট, টি-শার্ট আর গেঞ্জি থেকে শুরু করে কোথায় লোগো আর নাম ছিলোনা ছাত্রশিবিরের?
নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময়টাতে আন্দোলনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে আপোষহীন নেত্রী খালেদা জিয়া বলতেন, ডা. তাহের-কে খবর দাও! বেগম জিয়া জানতেন ডা. তাহেরের ছাত্ররাজনীতির পরিপক্বতার কথা।
ঢাকা মেডিকেল থেকে পাশ করা ডা. তাহের দেশ ও সংগঠনের প্রয়োজনে নিজের ক্যারিয়ার সেক্রিফাইস করে চিকিৎসা পেশায় কন্টিনিউ করেননি। ছিলেন আন্তর্জাতিক ছাত্র জোট ইফসুর মহাসচিবও।
ডা. তাহেরের সহধর্মিণী ডা. হাবিবা আক্তার চৌধুরী দেশসেরা ইবনে সিনা মেডিকেল কলেজের রেডিওলজি বিভাগের প্রধান। ডা. তাহেরের নিজ হাতে গড়া কুমিল্লার পদুয়ার বাজার বিশ্বরোডে অবস্থিত সেন্ট্রাল মেডিকেল কলেজ এবং এটাচ্ হসপিটাল কুমিল্লা মেডিকেল সেন্টার পরিচালিত হচ্ছে অত্যন্ত সুনামের সাথে।
ওয়ামী বাংলাদেশের প্রধানের দায়িত্বে থাকা অবস্থায় অভিযোগ ওঠে স্বচ্ছতা নিয়ে, তখন তিনি অবিভক্ত ঢাকা মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি ছিলেন, চূড়ান্ত তদন্তের আগেই জামায়াত তাঁর পদ স্থগিত করে দেয়!
রুকনিয়াত ব্যাতিরেকেই ২০০১ এর জাতীয় নির্বাচনে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম থেকে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হোন ৮ম জাতীয় সংসদের সদস্য।
হাজার হাজার চৌদ্দগ্রামবাসীর সামনে দাঁড়িয়ে ২০০১ এর সর্বশেষ নির্বাচনী জনসভায় ডা. তাহের শুধু বলেছিলেন,
❝আমি কি আপনাদের সন্তান নই? এই চৌদ্দগ্রামের কাঁদামাটি, আলো-বাতাস কি আমার শরীরে লাগেনি?❞
খবর্কায় তাহেরের ডুকরে কাঁদা শেষ বক্তব্যই চৌদ্দগ্রামবাসীর হৃদয় কেড়ে নেয়।
পরবর্তীতে অবশ্য ডা. তাহের সঠিক ছিলেন তা প্রমানিত হওয়ায় আবারো দল তাকে ফিরিয়ে নেয়। দলে ফিরেই হয়ে যান কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও কেন্দ্রীয় ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স সেক্রেটারী।
১/১১ ফখরুদ্দিন-মঈনুদ্দিন সরকার তাকে দুর্নীতির অভিযোগ গ্রেফতার করে কারাগারে রাখে। তৎকালীণ দুদক ডা. তাহেরের এক পয়সারও দুর্নীতির প্রমান না পাওয়ায় একমাত্র বাংলাদেশী রাজনীতিক, যাকে ❝করাপশন ফ্রি সার্টিফিকেট❞ প্রদান করে!
একজন ডা. তাহের। বাংলাদেশী রাজনীতিবীদ ও সুদক্ষ এক ইসলামী নেতৃত্ব! সাথে কুটনৈতিক পদচারণায় জুড়ি নেই তাঁর, বন্ধুর মতো চলাফেরা করেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত সহ বড় দেশসমূহের কুটনীতিকদের সাথে।
হয়েছেন একাধিকবার এমপি। এখন তিনি জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতা ও সরকারী হিসাব সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি এবং বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ ইসলামী রাজনৈতিক সংগঠন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নায়েবে আমীর।
ডা. তাহের শিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি থাকাকালে মালয়েশিয়া সফরকালে সাক্ষাত করেছিলেন আনোয়ার ইবরাহিমের সাথে। বিপ্লবী নেতা ও বর্তমান মালেশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইবরাহিম সাক্ষাৎ পরবর্তী সময়ে মন্তব্য করেছিলেন এইরূপ ❝বাংলাদেশের জনগণের ভাগ্য ভালো যে, তাঁরা ডা. তাহেরের মতো একটা নেতৃত্ব পেয়েছে❞
বাংলাদেশ একজন ডা. তাহের তৈরী করতে পারলেও, সদ্ব্যবহার করতে পারেনি! কে জানে, উন্নত বিশ্বে ডা. তাহের-রা জন্মালে হয়ত তিনিই হয়ে ওঠতেন নেলসন ম্যান্ডেলা, ফিদেল কাস্ত্রো, সাদ্দাম হুসেইন, এরদোয়ান কিংবা ইমরান খাঁনের মতো একজন তুমুল প্রভাবশালী বিশ্বনেতা!
যেই সৈয়দ তাহের তারুণ্যে হারেনি নফসের কাছে!
ছাত্রজীবনে হারেনি স্বৈরশাসকের কাছে!
যৌবনে হারেনি লোলুপ কোনো অফারের কাছে!
প্রৌঢ়ত্বে হারেনি ভারতীয় আধিপত্যের কাছে!
কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার আলকরা ইউনিয়নের পশ্চিম ডেকরা গ্রামের সম্ভ্রান্ত সৈয়দ পরিবারে ১৯৫৮ সালে জন্মগ্রহণ করা সেই ডাক্তার সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের আজ হেরে গেলেন সময়ের কাছে, বয়সের কাছে, স্বাস্থ্যের কাছে!
আশির দশকের লাখো ছাত্র-জনতার নিকট কারিশমাটিক লিডার, প্র্যাগমেটিক লিডার ও সিনেমাটিক লিডার ডাক্তার সৈয়দ আব্দুল মোহাম্মদ তাহের গত ৩০/০৮/২০২৬ তারিখে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের দ্বিতীয় কার্যদিবসে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে স্পষ্টতই তাঁর হাত কাঁপছিলো, কণ্ঠস্বর ভারী ছিলো!
বাংলাদেশ ঢের মিস করবে একজন ডা. তাহেরকে, যুগ থেকে যুগান্তরে! মহান রব্বুল আ’লামীন জাতীর প্রয়োজনে আর কিছুকাল এই বিদগ্ধ রাজনীতিবীদকে সুস্থতার সাথে আমাদের মাঝে বাঁচিয়ে রাখুন।।
আমীন! ইয়া রব্বাল আ’লামীন!
(সম্পাদক, দ্য ঢাকা অবজার্ভার।)

| ২ নভেম্বর ২০২৬








