জামায়েত কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও চট্টগ্রাম মহানগরের আমীর নজরুল ইসলাম তাঁর ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে ধারাবাহিক লিখার অংশ হিসেবে আজ লিখেন…
❝ইসলামী ব্যাংকে বৈষম্য-৩: নিয়োগে ত্রুটির হোতাদের আড়ালে রেখে নিয়োগপ্রাপ্তদের উপর দায় চাপানো জেনাকারকে আড়াল করে জারজ সন্তানকে দোষ দেয়ার সমতুল্য।
নিয়োগে ত্রুটি:
২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে থাকা অবস্থায় ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি-তে কোনো ধরনের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি বা লিখিত পরীক্ষা ছাড়াই প্রায় ৮,৫০০ কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, যার প্রায় ৯৫ শতাংশই ছিল নির্দিষ্ট একটি জেলার (চট্টগ্রাম, বিশেষ করে পটিয়া উপজেলা) প্রার্থী। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনে এই বড় ধরনের নিয়মবহির্ভূত ও ত্রুটিপূর্ণ নিয়োগের তথ্য উঠে আসে। নিয়োগ প্রক্রিয়ার প্রধান ত্রুটি ও অনিয়ম হলো বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই নিয়োগ, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা ছাড়া অন্তর্ভুক্তি, আঞ্চলিক বৈষম্য এবং স্বজনপ্রীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিয়মনীতি ও ব্যাংকের চাকরির প্রবিধান লঙ্ঘন।
ত্রুটিপূর্ণ নিয়োগের দায়:
ত্রুটিপূর্ণ নিয়োগের দায় বাংলাদেশ ব্যাংক এবং ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনার সাথে সংশ্লিষ্ট সিনিয়র কর্মকর্তাদের উপরও বর্তায়। এই ত্রুটি ও অনিয়মের দায় সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো এড়াতে পারে না। কারণ-
(১) ২০১৭ সালে এস আলম গ্রুপ ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পরপরই তাদের মানবসম্পদ নীতিমালায় “জরুরি প্রয়োজনে বিশেষ শিথিলতা” সংক্রান্ত একটি ধারা যুক্ত করা হয়। ব্যাংকের তৎকালীন শীর্ষ ব্যবস্থাপনা (এমডি, এএমডি, ডিএমডি এবং মানবসম্পদ বিভাগের প্রধানগণ) এই ধারার অপব্যবহার করে ১৬টি ধাপে কোনো বিজ্ঞপ্তি ও পরীক্ষা ছাড়াই হাজার হাজার কর্মী নিয়োগের নথিতে স্বাক্ষর করেছেন।
(২) ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দায়িত্ব ছিল প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন বজায় রাখা। কিন্তু কর্পোরেট সুশাসনকে তোয়াক্কা না করে পটিয়ায় এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যানের বাসভবন ও আসদগঞ্জের ব্যবসায়িক কার্যালয়ে জমা পড়া সিভি বক্স থেকে সরাসরি লোকবল নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা বা ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এই বেআইনি প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে কোনো আপত্তি তোলেনি।
(৩) কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে দেশের যেকোনো ব্যাংকের ওপর নিয়মিত এবং বিশেষ পরিদর্শন চালানোর আইনি এখতিয়ার বাংলাদেশ ব্যাংকের রয়েছে। টানা সাত বছর ধরে একটি ব্যাংকে পরীক্ষা ও বিজ্ঞপ্তি ছাড়া নিয়োগ হলো, অথচ কেন্দ্রীয় ব্যাংক সময়মতো কোনো শাস্তিমূলক বা সংশোধনী পদক্ষেপ নেয়নি।
(৪) কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রশাসনের এক ধরনের পরোক্ষ প্রশ্রয় বা নীরবতা না থাকলে এত বড় অনিয়ম বছরের পর বছর ধরে চলতে পারত না। নিয়মতান্ত্রিক অডিট বা পরিদর্শনে এটি আগেই ধরা পড়ার কথা ছিল, যা ব্যাংক খাতের সামগ্রিক সুশাসনকে দুর্বল করেছে।
উপসংহার:
নিয়োগে ত্রুটির হোতাদের আড়ালে রেখে নিয়োগপ্রাপ্তদের উপর দায় চাপানো জেনাকারকে আড়াল করে জারজ সন্তানকে দোষ দেয়ার সমতুল্য। অথচ ‘ন্যাচারাল ল অব জাস্টিস’ বলেন অথবা ‘ইসলামী নীতিমালা’ বলেন একজনের দায় আরেক জনকে চাপানো যায় না।
বাংলাদেশে ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট’ অবস্থা (শতকরা ষাট ভাগের মানুষ কর্মক্ষম) থাকা সত্ত্বেও বেকারত্বের কারণেই তো সুফল ভোগ করা যাচ্ছে না। এমতাবস্থায় বেকারত্বের অভিশাপে জর্জরিত বাংলাদেশের যুবকেরা চাকুরির জন্য হন্যে হয়ে ঘুরবে এটাই তো স্বাভাবিক।
স্বয়ং আখেরি নবী মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াছাল্লাম জেনাকারীনির স্বীকারোক্তির কারণে হদ জারি করেছিলেন কিন্তু ‘জারজ সন্তান’ এর জীবনের পূর্ণ নিরাপত্তা দিয়েছিলেন। হযরত ওমর রা: অভাবের কারণে চুরি করার দায় শ্রমিকের উপর চাপাননি বরং মালিককেই দায় দিয়েছিলেন।
যারা ত্রুটিপূর্ণ নিয়োগের শতভাগ দায় কর্মচারিদের উপর দিয়ে জাস্টিফাই করছেন তাদের কি বিবেক মরে গেছে?❞